হটচেয়ার, নেতাদের পাঠ্যভ্যাস ও গাজীমুড়ায় বিয়ে ভীতি

হটচেয়ার, নেতাদের পাঠ্যভ্যাস ও গাজীমুড়ায় বিয়ে ভীতি

এম.এস.দোহা:- লাকসামে এলাকাভিত্তিক ‘খুটি’র জোরের প্রেক্ষাপট সবার জানা। গাজীমুড়া, পশ্চিমগাঁও, উত্তরবাজার, জংশন এলাকার আতঙ্ক ও ভীতি অনেকের মাঝে ইতিপূর্বেও বিরাজ করতো। গাজীমুড়ার ভীতিটা একসময়ে একটু বেশীই ছিল। কারণ নেতৃত্বে, শাসনক্ষমতায় গাজীমুড়া ছিল বেশীরভাগ সময়। আর ক্ষমতাশালী লোক এলাকায় থাকলে একশ্রেণির শরীরে ‘আলী আজম’ বা উত্তেজনা এসে যায়। একটি শুনা কাহিনী না বললে অতৃপ্তি থেকে যাবে। গাজীমুড়ার একলোক তুচ্ছ কারণে বউকে পেটাল। গ্রামের পঞ্চায়েত জামাই মশাইকে ধরে নিয়ে আসে। শালিসে জামাতা অভিযুক্ত। তার কপালে থ্রেট, লাঞ্চনা….। এক পর্যায়ে জামাতা নিজেই কান ধরে উঠা বসা শুরু করে। আর বলে- গাজীমুড়া বিয়ে করে যোগ্য পুরষ্কার পেলাম! জীবনে আর কোন দিন বউকে চোখ রাঙাবো না। আর তার চৌদ্দগোষ্ঠির কেউ যেন এ গ্রামে বিয়ে না করে তাও অছিয়ত করে যাবেন।
এসব কারণে যাদের মেজাজ গরম অর্থাৎ বদমেজাজী। নুন থেকে চুন খসলে বউকে পেটানোর বদ অভ্যাস, তারা এসব এলাকায় বিয়ে করাটা ‘রিক্স’ মনে করতেন। স্ত্রীর সাথে কোন কারণে ঝগড়া বাঁধলেও শাসন করতো সমীহ করে। বিষয়টিকে আমি অবশ্য নিছক গল্প হিসেবে দেখতে চাই। কারণ, উল্লেখিত এলাকার অনেক সম্ভ্রান্ত, ন¤্র, ভদ্র, রুচিশীল, মানবিক পরিবারের সদস্যদের আমি ব্যক্তিগত জানি ও চিনি। তাদের সম্মান ও শ্রদ্ধাও করি শতভাগ। সুতরাং সবাইকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক নয়।
তবে একথা স্বীকার করতে হবে, ভৌগলিক কারনে উল্লেখিত এলাকার আবহাওয়া এমনিতেই গরম। এসব এলাকার নেতা ও সমাজপতিদের ‘জ্বলালী মেজাজ’ এর নেপথ্যে রয়েছে অনেক কারণ। তারমধ্যে অন্যতম সিন্ডিকেট বাণিজ্য। বিভিন্ন সরকারের আমলে চাল-গম বরাদ্দের সিন্ডিকেটের সাথে সম্পৃক্ত থাকার সুবাদে তারা কেউ হয়েছেন রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ। ভাঙাচোরা চেহারা হয় তেল চকচকে। তাই একটু হাক-ডাক থাকাই স্বাভাবিক।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গাজীমুড়ার চাঁন-সুরুজের নাম ডাক পাকিস্তান আমল থেকে। সুতরাং গাজীমুড়াবাসীর কপাল পোয়াবারো। এরশাদের জামানায় মোকছোদ আলী ও রেলজংশন এলাকা ছিলো আলোচনার শীর্ষে। আবার এটিএম আলমগীর এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে উত্তরবাজারে বিএনপি নেতারা ছিলেন ফর্মে। কর্নেল আজিমের ৫ বছরে লাকসামের সর্বময় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিলো গাজীমুড়া তথা সাইফুল ইসলাম হিরু।
এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হয়েছে এমপি তাজুল ইসলামের ১৫ বছরের কর্মকান্ডে। গাজীমুড়া, জংশন, উত্তরবাজার, পশ্চিমগাঁও নিয়ন্ত্রকারীদের কৌশলে কাজে লাগিয়েছেন। ‘ইজারা’ বলতে যা বুঝায় তা কাউকে দেননি। লাকসাম-মনোহরগঞ্জের বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনেক সৈনিককে জনপ্রিয় রিয়ালিটি শো অমিতাভ বচ্চনের ‘কোন বনেগা কোড়প্রতি’ স্টাইলে ‘হটচেয়ারে’ বসার সুযোগ দিয়েছেন। উদ্দেশ্য একটাই এলাকার উন্নয়ন, সমাজে ন্যায়-বিচার প্রতিষ্ঠা ও সংগঠনের গতিশীলতা আনতে এমপি সাহেবকে সহায়তা করা। সহযোগিতার উদ্দেশ্যে এই ‘হট চেয়ারে’ বসেছেন অনেকেই। কিন্তু এর স্থায়িত্ব কেউ দীর্ঘসময় ধরে রাখতে পারেননি। কারণ দায়িত্ব পালনরত নেতাদের কর্মকান্ডের হিসেব নিকেশ বা আমলনামা গোপনে ঠিকই মিলিয়ে দেখেন তাজুল ইসলাম। ফলে একক ও দীর্ঘকালীন অধিপত্য বিস্তারের সুযোগ কারো কপালে জোটেনি। যার সুফল সাধারণ মানুষ ভোগ করেছে।

॥২॥
গত ১৪ জুলাই লাকসাম গিয়েছিলাম বাতাখালী হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রয়োজনে। লাকসামের ৩০টি এতিমখানা ও মন্দিরের জন্য ১টন করে চাউলের বরাদ্দপত্র প্রদান করেন সংসদ সদস্য তাজুল ইসলাম। ঘটনাচক্রে উক্ত অনুষ্ঠানে আমার অংশগ্রহণ সুযোগ হয়েছে। দেখলাম বরাদ্দপত্রের সাথে সাথে খাদ্য কর্মকর্তা, পিআইও’র তৎক্ষনাত ছাড়পত্র! একই দিনেই বরাদ্দপত্র, গুদাম থেকে চাউল খালাস! এজন্য বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে অতিরিক্ত কোন খরচ গুনতে হয়নি। নিতে হয়নি টোকেন ? এ যেন আলাউদ্দিনের চেরাগ। যা ইতিপূর্বে কোন সরকার বা সংসদ সদস্যের আমলে হয়নি। এধরনের ইতিবাচক নির্দেশনা প্রদান করায় এমপি তাজুল ইসলাম সত্যিই প্রশংসার দাবীদার।
প্রসঙ্গ উল্লেখ্য যে, ধর্মীয় এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে অধ্যায়নরত এতিম, অনাথ শিক্ষার্থীদের ফ্রি থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এতিমখানার জন্য এই চাউলগুলো খুব কাজে লাগবে। একটি এতিমখানা পরিচালনার সাথে জড়িত বিধায় প্রায় চাউল সংকট মোকাবেলা করতে গিয়ে বুঝতে পেরেছি এটা কতবড় সহযোগিতা। তাই সরকারী চাউল বরাদ্ধ এলে এতিমখানাগুলোকে বরাদ্ধ ও সরাসরি চাউল সরবরাহের বিষয়টিকে প্রধান্য দেওয়া প্রয়োজন। কারণ খোঁজ খবর নিলে জানা যাবে এই চাউলের প্রায় শতভাগই এতিম অনাথ শিক্ষার্থীর আহার যোগানে কাজে আসে।

॥৩॥
একইদিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেম্বারদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচী লাকসাম উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। সংসদ সদস্য তাজুল ইসলাম এই কর্মসূচী উদ্বোধন করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আমাদের স্থানীয় সরকার কাঠামোর ভাবমূর্তি এখন প্রায় অর্ধমৃত। চেয়ারম্যান মেম্বারদের দায়িত্ববোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। জন্ম-মৃত্যু সনদ বিতরনের মধ্যে তাদের কার্যক্রম অনেকটা সীমাবদ্ধ। আবার গম-চাউল বরাদ্ধ নিয়ে অনেকেই নেতিবাচক আলোচনা সমালোচনায় পড়েন।
তৃনমুল পর্যায়ে যদি জনপ্রতিনিধিরা সজাগ, সতর্ক, আন্তরিক থাকেন তাহলে সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ, মাদকের ভয়াবহতা থেকে দেশকে রক্ষা করা কঠিন হবে না। তাই মন্ত্রণালয়ের প্রদত্ত দিক-নির্দেশনা মূলক একটি বই জনপ্রতিনিধিদেরকে ভালো ভাবে পড়ার পরামর্শ দেন এমপি তাজুল ইসলাম। কিন্তু প্রশিক্ষনার্থীরা বইটি আদৌ পড়বেন কিনা তাই নিয়ে আমি সন্দিহান।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এখন বই পুস্তক পড়ার কালচার প্রায় ওঠে গেছে। সবাই ফেসবুকে ‘লাইক’ আর ‘শেয়ার’এ ব্যাস্ত। কিছুদিন আগে সংসদে গিয়েছিলাম এমপি তাজুল ইসলামের সাথে। দীর্ঘদিনের চেনা-জানা এ প্রতিষ্ঠানটি অনেক দিন পর ঘুরে বেড়ালাম। কৌতুহল বসত গেলাম সংসদ লাইব্রেরীতে। দেশের বৃহৎ বইয়ের সংগ্রহশালা এটি। বেরুতে দেখা হলো সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে। তিনি আমাকে চিনতেন সাপ্তাহিক আজকের সূর্যোদয়ের সাংবাদিক হিসেবে। দেখেই বুকে টেনে নিলেন। বললেন বাংলার বানী, আজকের সূর্যোদয় সব মনে আছে। উল্লেখ্য, ওবায়দুল কাদের এরশাদের শাসনামলে দৈনিক বাংলার বানীতে সাংবাদিকতা করতেন। মাঝে মাঝে যেতাম সাংবাদিকতার প্রয়োজনে। আজকের সূর্যোদয় পত্রিকায় তার সাক্ষাৎকার ছেপেছি বহুবার। বললাম- লিডার, সংসদ লাইব্রেরী এখন পাঠকশূন্য। এমপিরা লাইব্রেরীকে এড়িয়ে চলেন। তিনি মাথা নেড়ে সম্মতি জানলেন। বললেন অপেক্ষা কর, বইয়ের কদর আবার বাড়বে।
উল্লেখ্য, এমপি তাজুল ইসলাম যে একজন ভালো পাঠক এটা অনেকেরই অজানা। বিষয়টি ৯৬ সালেই আমার দৃষ্টিগোচর হয়। বিদেশ ভ্রমণের সময় কয়েকদফা এয়ারপোর্টে গিয়েছিলাম তার সঙ্গে। প্রতিবারেই দেখেছি এয়ারপোর্টের বুক কর্ণার থেকে মূল্যবান কিছু বই কিনতে। বিমানে ও বিদেশে অবস্থান কালে বইগুলো তিনি পড়তেন। অফিস-বাসায় সুযোগ পেলেই তিনি বই, পত্র- পত্রিকা পড়েন। এক্ষেত্রে আগ্রহ আছে বলেই ‘প্রতিদিনের সংবাদ’ নামক একটি জাতিয় দৈনিক তিনি প্রকাশ করে আসছেন। টিভির টকশোগুলোতে তার জ্ঞানগর্ব, যুক্তিতর্ক ও সভা-সমাবেশে বক্তৃতায় যার প্রভাব বিদ্যমান।
পরিশেষে এটুকু বলা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশকে কাঙ্খিত উন্নয়নে পৌঁছাতে জ্ঞান, মেধা সমৃদ্ধ ও আলোকিত নেতৃত্বের বিকল্প নেই। সুতরাং শত ব্যস্ততার মাঝেও পাঠ্যভ্যাস সকলের জন্যই জরুরী। আর রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের জন্য বিষয়টি আরও বেশী জরুরী।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও মানবাধিকার সংগঠক

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: কামাল উদ্দিন
মোবাইল: ০১৮১৯০৩২০৯০
৬০/বি, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ হইতে প্রকাশিত। মোবাইল: 01819032090, ইমেইল: [email protected]